ওয়ালস্ট্রিট থেকে সরে বিদেশী বাজারে ঝুঁকছেন মার্কিন বিনিয়োগকারীরা

গত ১৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ওয়ালস্ট্রিট থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছেন মার্কিন বিনিয়োগকারীরা। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় ভাটা ও বিদেশের শেয়ারবাজার অধিক লাভজনক হয়ে ওঠায় এ পথে হাঁটছেন তারা। খবর রয়টার্স।

এলএসইজি/লিপারের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ইকুইটি বা শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগ থেকে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছেন। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের শুরু থেকেই সরিয়ে নেয়া হয়েছে ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার। ২০১০ সালের পর বছরের প্রথম আট সপ্তাহে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের এ হার সর্বোচ্চ।

বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে ডলার দুর্বল হওয়ায় বিদেশী সম্পদ কেনা মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে; তা সত্ত্বেও দেশটিতে বহির্মুখী বিনিয়োগ থেমে নেই। মার্কিন সম্পদ থেকে সরে এসে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনার যে প্রবণতা গত বছর শুরু হয়েছিল, তা এখন স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও প্রবল হয়ে উঠেছে।

২০০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দা-পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী অর্থনীতি, প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তি খাতের একচ্ছত্র আধিপত্যের সুবাদে ‘বাই আমেরিকা’ বা মার্কিন সম্পদ কেনার প্রবণতা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের দারুণ মুনাফা উপহার দেয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জয়জয়কার গত বছর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচককে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

কিন্তু এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও এর ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ায় ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারের আকর্ষণ কমতে শুরু করেছে। এতদিন পর্যন্ত মার্কিন ‘মেগাক্যাপ’ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরের যে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন ছিল, তা এখন বিনিয়োগকারীদের অনেক বেশি সতর্ক করে তুলেছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারীই অন্য দেশের বাজারে অধিক লাভজনক সুযোগের সুবিধা নিচ্ছেন। ব্যাংক অব আমেরিকার ফেব্রুয়ারির ‘ফান্ড ম্যানেজার সার্ভে’ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে মার্কিন ইকুইটি থেকে উদীয়মান বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।

ইউবিএসের ইউরোপিয়ান ইকুইটি অ্যান্ড গ্লোবাল ডেরিভেটিভস স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান জেরি ফাউলার বলেন, ‘আমি চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায় যুক্ত অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছি। তারা সবাই এখন বিদেশের বাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলছেন।’

তিনি আরো যোগ করেন, গত বছরের শেষে ডলারের বিপরীতে বিদেশী বাজারগুলোর মুনাফার চিত্র দেখে মনে হয়েছে, তারা বড় ধরনের লাভের সুযোগ হাতছাড়া করছেন।

এলএসইজি/লিপারের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর মার্কিন বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান বাজারের শেয়ারে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি ডলার ও ব্রাজিলে ১২০ কোটি ডলার বিনিয়োগ গিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিমালার প্রভাবে গত জানুয়ারি থেকে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে ডলার প্রায় ১০ শতাংশ দুর্বল হয়েছে। এটি বিদেশী বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিনদের জন্য কিছুটা ব্যয়বহুল। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশের চাঙ্গা শেয়ারবাজার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ ডলারে রূপান্তর করা হলে অর্থের পরিমাণ হবে বেশ আকর্ষণীয়।

গত ১২ মাসে যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ, সেখানে ডলারের হিসেবে টোকিওর নিক্কেই ৪৩ শতাংশ এবং ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচক বেড়েছে ২৬ শতাংশ। একই সময়ে সাংহাইয়ের সিএসআই ৩০০ সূচক থেকে ২৩ শতাংশ রিটার্ন এসেছে এবং সিউলের কেওএসপিআই সূচকের মান দ্বিগুণ হয়েছে।

এনভিডিয়া, মেটা এবং মাইক্রোসফটের মতো এআই খাতের জায়ান্টগুলোর শেয়ারদরের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও উচ্চমূল্যায়নের ঝুঁকি এখন নতুন করে ভাবাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে তারা এখন জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড বা জাপানের মতো বাজারে প্রথাগত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও রক্ষণশীল শেয়ারগুলোয় বিনিয়োগের নিরাপদ সুযোগ খুঁজছেন।

অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারের দাম এখনো অনেক বেশি চড়া। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারগুলো বর্তমানে প্রত্যাশিত আয়ের প্রায় ২১ দশমিক ৮ গুণ দামে কেনাবেচা হচ্ছে। এর বিপরীতে ইউরোপীয় শেয়ারবাজারের দর প্রত্যাশিত আয়ের ১৫ গুণ, আর জাপান ও চীনের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ১৭ ও ১৩ দশমিক ৫ গুণ।

অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান কারমিগনাকের পোর্টফোলিও উপদেষ্টা কেভিন থোজেট জানান, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপের বাজারে মার্কিন পুঁজির প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

আরও